
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ফলাফলের পর সরকার গঠন করেছে বিএনপি। আর কুড়িগ্রামের সব কটি আসন উপহার পেয়েছে জামায়াতের নেতৃত্বাধীন জোট। স্বভাবতই তাদের অবস্থান বিরোধী দলে। বরাবরই দেশের উন্নত অঞ্চলের তুলনায় পিছিয়ে পড়া জেলা কুড়িগ্রাম। এখন মানুষের মাঝে আলোচনার একটাই বিষয়-সরকার এদিকের উন্নয়নে নজর দেবে তো? নাকি এবারও বঞ্চিত আর বৈষম্যের শিকার হবে?
অনেকে বলছেন, কুড়িগ্রাম বঞ্চনার শিকার হওয়ার মূল কারণ সরকার গঠন করে একদল আর কুড়িগ্রামে সংসদ-সদস্য নির্বাচিত হন বিরোধী দলের। ফলে অধিকার আদায় করার নেতা থাকে না। কুড়িগ্রামে ৪টি আসনের মধ্যে ৩টিতে জামায়াতে ইসলামী এবং অন্যটিতে তাদের জোট সমর্থিত জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) প্রার্থী জয় লাভ করেছেন। জাপার ঘাঁটি বিবেচিত এ ৪ আসনেই বিএনপি ও জাতীয় পার্টির প্রার্থীদের চরম ভরাডুবি হয়েছে।
জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে বিএনপি ও জাতীয় পার্টির নেতৃত্বে ঠেলাঠেলি, অবিশ্বাস ও কোন্দলের কারণেই এই ভরাডুবি। তবে এ নির্বাচনে ভোটের ফলাফলে নারী ভোটারদের উপস্থিতি বিশেষ ভূমিকা রেখেছে বলে মনে করা হচ্ছে।সার্বিকভাবে ৪টি আসনে মোট ২৮ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন।
এর মধ্যে কুড়িগ্রাম-১ আসন থেকে ৬ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন। তাদের মধ্যে জামায়াত প্রার্থী মো. আনোয়ারুল ইসলাম ১ লাখ ৪১ হাজার ৯০ ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছেন। তার প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির সাইফুর রহমান রানা পেয়েছেন ১ লাখ ২৩ হাজার ৬৫ ভোট। এ আসনে জাতীয় পার্টির সাবেক এমপি একেএম মোস্তাফিজুর রহমান পেয়েছেন ৫০ হাজার ৭২৭ ভোট, বাংলাদেশ ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থী মো. হারিসুল বারী পেয়েছেন ৩৮ হাজার ৮০৭ ভোট, জাকের পার্টির আব্দুল হাই পেয়েছেন ২ হাজার ৯০৭ ভোট এবং গণঅধিকার পরিষদ প্রার্থী বিন ইয়ামীন মোল্লা জামায়াত প্রার্থীকে সমর্থন জানিয়ে নির্বাচন থেকে সড়ে দাঁড়ালেও তিনি পেয়েছেন ২৩১ ভোট।
কুড়িগ্রাম-২ আসন থেকে ৯ জন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন। এর মধ্যে জাতীয় নাগরিক পার্টির প্রার্থী মো. আতিকুর রহমান (ড. আতিক মোজাহিদ) শাপলা কলি প্রতীক নিয়ে ১ লাখ ৮০ হাজার ৫২৬ ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছেন। তার নিকটতম প্রার্থী বিএনপির সোহেল হোসনাইন কায়কোবাদ ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে পেয়েছেন ১ লাখ ৭১ হাজার ৪০৫ ভোট। ড. আতিক মোজাহিদ ৯ হাজার ১২১ ভোটের ব্যবধানে বিজয়ী হয়েছেন।
কুড়িগ্রাম-৩ আসন থেকে ৬ জন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন। এর মধ্যে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী ব্যারিস্টার মাহবুবুল আলম সালেহী ১ লাখ ৭ হাজার ৯৩০ ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছেন। তার প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির তাসভীর উল ইসলাম পেয়েছেন ৭৯ হাজার ৩৫২ ভোট। ব্যারিস্টার মাহবুবুল আলম সালেহী ২৮ হাজার ৫৭৮ ভোটের ব্যবধানে বিজয়ী হয়েছেন।
কুড়িগ্রাম-৪ আসন থেকে ৭ জন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন। এর মধ্যে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মো. মোস্তাফিজুর রহমান ১ লাখ ৮ হাজার ২১০ ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছেন। তার প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির মো. আজিজুর রহমান পেয়েছেন ৮৪ হাজার ৪২৩ ভোট। মোস্তাফিজুর রহমান ২৩ হাজার ৭৮৭ ভোটের ব্যবধানে বিজয়ী হয়েছেন।
নির্বাচনের শুরু থেকেই বিএনপি কুড়িগ্রাম-১, কুড়িগ্রাম-২ ও কুড়িগ্রাম-৩ আসনে ইতিবাচক ফলাফল করবে বলে মনে করা হচ্ছিল। এছাড়া কুড়িগ্রাম-৪ আসনে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী এগিয়ে থাকলেও সেখানে বিএনপি ভালো করবে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছিল। অপরদিকে কুড়িগ্রাম-১ আসনে জাতীয় পার্টির সাবেক ৫ বারের এমপি একেএম মোস্তাফিজুর রহমান ত্রিমুখী লড়াইয়ে এগিয়ে থাকবেন বলে মনে করা হলেও সব হিসাব-নিকাশ পালটে দিয়েছে ভোটাররা। বিশেষ করে নারী ভোটারদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো।
কুড়িগ্রামে ৪টি আসনের মধ্যে ৩টি আসনে বিএনপি প্রার্থী পরাজিত হলেও কুড়িগ্রাম-২ আসনে বিজয়ী হবে বলে বিএনপি কর্মী-সমর্থকরা চ্যালেঞ্জ করলেও সাধারণ মানুষের ভোট সব হিসাব-নিকাশ পালটে দিয়েছে। জাতীয় পার্টি ও আ.লীগের ঘাঁটি বলে বিবেচিত কুড়িগ্রামের ৪টি আসনেই মানুষ জামায়াত সমর্থিত প্রার্থীকে তাদের সমর্থন জানিয়েছেন। এই ফলাফল নিয়ে অনেক চুলচেরা বিচার-বিশ্লেষণ করা হলেও বিএনপির পরাজয়ের জন্য দলীয় কোন্দলকে দায়ী করা হচ্ছে। অপরদিকে নির্বাচনে ভোটারদের কাছে অন্য প্রার্থীদের মতো স্বাভাবিক পরিবেশ না পাওয়া এবং রক্তচক্ষু ও ভয়ভীতির কারণে জাতীয় পার্টির ভরাডুবি হয়েছে বলে প্রার্থীরা দাবি করেছেন।
তবে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জামায়াতের পাশাপাশি ভালো ফলাফল করেছে বিএনপিও। এখন অপেক্ষা বিরোধী চেয়ারে বসে পিছিয়ে পড়া কুড়িগ্রাম জেলার জন্য বিজয়ী জামায়াত ও এনসিপি সংসদ-সদস্যরা বিএনপি সরকারের কাছ থেকে কতটুকু সহায়তা পান এবং সেটি দিয়ে কতটুকুই বা উন্নয়ন করতে পারেন পিছিয়ে পড়া এই জেলাবাসীর জন্য।
মন্তব্য করুন