
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে কুড়িগ্রাম-১ (নাগেশ্বরী–ভুরুঙ্গামারী) আসনে নির্বাচনী প্রচারণায় সরকারি ও বেসরকারি শিক্ষকদের সরাসরি সম্পৃক্ততার একটি বিস্তৃত চিত্র উঠে এসেছে অনুসন্ধানে।
সরকারি আইন ও নির্বাচন কমিশনের আচরণবিধি উপেক্ষা করে প্রায় শতাধিক শিক্ষক বিভিন্ন ইউনিয়নে প্রচারণা সমন্বয়, মিছিল, সভা এবং সাংগঠনিক দায়িত্ব পালন করছেন বলে একাধিক নির্ভরযোগ্য সূত্র নিশ্চিত করেছে।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, নির্বাচনী প্রচারণায় শিক্ষকরা কেবল সমর্থক হিসেবে নয়, বরং প্রধান সমন্বয়ক, ইউনিয়নভিত্তিক দায়িত্বশীল এবং নির্বাচনী এজেন্ট হিসেবেও সক্রিয় ভূমিকা পালন করছেন।
সরকারি কলেজের প্রভাষক আজহারুল ইসলাম আল আমিন প্রার্থীর প্রধান নির্বাচনী এজেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি দলের নির্বাচনী নিয়ম অনুযায়ী আয়োজিত নির্বাচনী প্রশিক্ষণেও অংশ নিয়েছেন বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে।
একই আসনের ভূরূংগামারী উপজেলার প্রভাষক শহিদুল ইসলাম আকন্দ উপজেলা নির্বাচন সমন্বয়ক হিসেবে দায়িত্ব প্রাপ্ত।নাগেশ্বরী উপজেলার বেসরকারি শিক্ষক সমিতির সভাপতি ও আইডিয়াল উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মোঃ শহিদুল ইসলাম ও নাগেশ্বরী উপজেলার নির্বাচনী সমন্বয়ক হিসেবে দায়িত্ব প্রাপ্ত হয়ে মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন।
আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, একজন সরকারি কলেজের শিক্ষক সরাসরি প্রধান নির্বাচনী এজেন্ট হওয়া সরকারি কর্মচারী (আচরণ) বিধিমালা, ১৯৭৯,২০২৫ -এর সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।
অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, বিভিন্ন ইউনিয়নে দায়িত্ব পালন করছেন- নাগেশ্বরী হলদিকুড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আকবর আলী, নেওয়াশী জাগরণী বালিকা বিদ্যালয়ের সিনিয়র শিক্ষক আজিজার রহমান, কালীগঞ্জ বালিকা বিদ্যালয়ের সিনিয়র শিক্ষক ইউসুফ আলী,জামতলা বালিকা বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আব্দুল মোমেন,ভূরুঙ্গামারী সরকারি কলেজের প্রভাষক আব্দুল জলিল, নুনখাওয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের সিনিয়র শিক্ষক রিয়াজুল ইসলাম,নুনখাওয়া বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক জিয়া উদ্দিন।
এছাড়াও নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক সূত্র জানিয়েছে, মোট সংখ্যা শতাধিকের বেশি, যাদের মধ্যে সরকারি, এমপিওভুক্ত ও বেসরকারি শিক্ষক রয়েছেন। সরকারি কর্মচারী (আচরণ) বিধিমালা, ১৯৭৯-এর বিধি ২৫(১) অনুযায়ী- “কোনো সরকারি কর্মচারী কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত হতে, নির্বাচনী প্রচারণায় অংশ নিতে বা রাজনৈতিক কার্যক্রমে সহায়তা করতে পারবেন না। সরকারি কলেজ ও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা সরাসরি এই বিধিমালার আওতাভুক্ত। অতি সম্প্রতি ২০২৫ এ বেসরকারি শিক্ষকদের জন্যই একই আইন সংযুক্ত করা হয়েছে। এদিকে জাতীয় সংসদ নির্বাচন আচরণবিধি অনুযায়ী- কোনো প্রার্থী বা তার পক্ষে সরকারি কর্মচারীকে ব্যবহার করা নিষিদ্ধ।
শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও শিক্ষাঙ্গনে নির্বাচনী প্রচারণা সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ। এছাড়া Representation of the People Order (RPO), ১৯৭২ অনুযায়ী, নির্বাচনে প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা ক্ষুণ্ন হলে নির্বাচন কমিশনের শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষমতা রয়েছে। এত সংখ্যক শিক্ষক প্রকাশ্যে প্রচারণায় যুক্ত থাকার পরও কেন প্রশাসনিক কোনো দৃশ্যমান ব্যবস্থা নেই। এই প্রশ্ন আলোচনার কেন্দ্রে।
স্থানীয় পর্যায়ের একাধিক প্রশাসনিক সূত্র জানিয়েছে, বিষয়টি ‘সবার জানা’ হলেও এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক তদন্ত শুরু হয়নি।
একজন নির্বাচন পর্যবেক্ষক বলেন “শিক্ষকদের এভাবে মাঠে নামানো হলে সাধারণ ভোটারের মনে নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়েই সন্দেহ তৈরি হয়। শিক্ষক সমাজ ও নাগরিকদের প্রতিক্রিয়াস্থানীয় শিক্ষক সমাজের একাংশ নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন “রাজনৈতিক চাপ ও ভবিষ্যৎ সুবিধার আশায় অনেকেই মাঠে নেমেছেন। কিন্তু এর দায় পুরো শিক্ষক সমাজকেই বহন করতে হবে।
সচেতন নাগরিকদের মতে, শিক্ষকরা যখন প্রকাশ্যে দলীয় প্রচারণায় নামেন, তখন শিক্ষাঙ্গনের নিরপেক্ষতা ও নৈতিক অবস্থান মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এ বিষয়ে অভিযুক্ত শিক্ষকদের মতামত জানতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
কুড়িগ্রাম-১ আসনে শিক্ষকদের সংগঠিতভাবে নির্বাচনী প্রচারণায় যুক্ত হওয়ার ঘটনা শুধু একটি নির্বাচনী কৌশল নয়, বরং এটি আইন, আচরণবিধি ও প্রশাসনিক নিরপেক্ষতার ওপর সরাসরি আঘাত। বিষয়টি দ্রুত তদন্ত না হলে নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা ও শিক্ষক সমাজের মর্যাদা—উভয়ই প্রশ্নের মুখে পড়বে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
মন্তব্য করুন